পরকালে বিপর্যস্তদের করুণ আক্ষেপ

Wednesday, April 8th, 2020

পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াতে পরকালের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কিয়ামতের দিন পাপাচারী ও অবিশ্বাসীদের করুণ আক্ষেপের কথা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। এখানে তাদের আক্ষেপের কারণগুলো উল্লেখ করা হলো—

শিরকের জন্য আক্ষেপ

জঘন্যতম পাপ শিরক। পরকালে মুশরিকরা কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হয়েও মুক্তির পথ পাবে না। দুঃখের চরমে পৌঁছে তখন দারুণ অসহায়ভাবে বলবে—‘হায়, যদি আমি আমার প্রতিপালকের সঙ্গে কাউকে শরিক না করতাম।’ (সুরা কাহফ, আয়াত : ৪২)

আমল না করায় আক্ষেপ

পাপী-তাপীরা দুনিয়ার জীবনের অসারতা অনুভব করবে পরকালে এবং আফসোস করে বলবে—‘আফসোস, আখিরাতের জন্য যদি কিছু করতাম।’ (সুরা ফজর, আয়াত : ২৪)

আমলনামা না দেখার অভিপ্রায়

পাপীরা তাদের আমলনামায় নিজেদের অপকর্মের বিবরণ দেখে বিস্ময়-বিমূঢ় হয়ে বলতে থাকবে—‘আহ, যদি আমাকে আমলনামা না দেওয়া হতো!’ (সুরা আল হাক্কাহ, আয়াত : ২৫)

অস সঙ্গের জন্য আক্ষেপ

বন্ধুর সম্পৃক্ততা ব্যক্তির জীবনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু অসৎ বন্ধুর প্রভাবের করুণ পরিণতি বুঝে পরকালে পাপীদের কষ্টের উচ্চারণ হবে—‘আফসোস, যদি অমুককে বন্ধু হিসেবে বেছে না নিতাম।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ২৮)

যদি মাটি হতাম

দুনিয়ায় যেসব ইতর প্রাণী অন্য প্রাণীর আঘাতে কষ্ট পেয়েছিল, পরকালে তাদের অনুযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ প্রতিঘাত করতে বলবেন। এরপর ইতর প্রাণীগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে। তখন পাপীদের আক্ষেপের উচ্চারণ হবে—হায়, আমরাও যদি মাটির সঙ্গে মিশে যেতাম!’ (সুরা নাবা, আয়াত : ৪০)

রাসুলের অনুসরণ না করা

দুনিয়ায় যারা রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য অনুসরণ করেনি, তারা আক্ষেপ করে পরকালে বলতে থাকবে—‘আহা, আমরা যদি রাসুলের দেখানো পথে চলতাম।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ২৭)

ঈমানদারের সঙ্গী না হওয়ায় আফসোস

দুনিয়ার জীবনে যারা ঈমান-ইসলামের বিরোধিতা করেছে, মুমিনদের সঙ্গ নেয়নি, তারা আখিরাতে দেখবে মুমিনরাই সফলকাম। তখন আত্মখেদে বলবে, ‘হায়, আমিও যদি তাদের সঙ্গে থাকতাম, তবে তো বিরাট সাফল্য লাভ করতে পারতাম।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৭৩)

দুনিয়ায় ফিরে আসার মিথ্যা ইচ্ছা

যাদের পারলৌকিক জীবন ধ্বংস হয়েছে, তাদের নিষ্ফল আফসোস থাকবে—‘হায়, যদি এমন হতো, আমাদের আবার দুনিয়ায় পাঠানো হতো। তবে আমরা আমাদের প্রভুকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতাম না। বরং আমরা ঈমানদারদের সঙ্গী-সাথি হতাম।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ২৭)

পরকালে মানুষের কর্ম বা পাপের সাক্ষ্য-প্রমাণ চারটি উপায়ে উপস্থাপন করা হবে। কেউ তার অপরাধ অস্বীকার করতে পারবে না। যথা :

এক. অপরাধের স্থান বা মাটি

পরকালে পাপের স্থান পাপীর প্রথম সাক্ষী হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন জমিন নিজের ভেতরে রাখা যাবতীয় খবর বলে দেবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৪)

সুরা জিলজালের এ আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘যে জায়গায় মানুষ আমল করে ওই স্থানটি তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে থাকবে।’

দুই. মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ

পরকালে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার কর্মের সাক্ষী হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আজ (পরকালে) আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব। আর তাদের হাতগুলো কথা বলে উঠবে এবং তাদের পাগুলোও তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা ইয়াছিন, আয়াত : ৬৫)

তিন. দুই কাঁধের দুজন ফেরেশতা

মহান আল্লাহ সব মানুষের আমল সার্বক্ষণিক লিপিবদ্ধের জন্য ‘কিরামান-কাতিবিন’ নামে দুজন করে ফেরেশতা নিয়োজিত রেখেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘দুজন সম্মানিত ফেরেশতা, তোমরা যা করো তাঁরা তা সব জানেন।’ (সুরা ইনফিতার, আয়াত : ১১)

চার. মানুষের আমলনামা

ফেরেশতারা মানুষের সব কাজকর্ম লিখে রাখেন। ওই লিপিবদ্ধ সংকলনই ‘আমলনামা’। পরকালে মানুষের বিরুদ্ধে ‘আমলনামা’ হবে সাক্ষী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমলনামা উন্মুক্ত হবে…তখন প্রত্যেকেই জেনে নেবে সে কী উপস্থিত করেছে।’ (সুরা তাকবির, আয়াত : ১০)

আসলে মানুষ ভুল-ত্রুটি ও পাপাচারের ঊর্ধ্বে নয়। পাপ করা মানব বৈশিষ্ট্যের অংশ। মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে, অন্যদিকে ক্ষমা করা মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম গুণ। শুধু তা-ই নয়, চরম অপরাধীরও তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দারা। যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হইয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ মার্জনা করেন, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার, আয়াত : ৫৩)

কাজেই সময় এখন তাওবা করার, নিজেকে শুধরে নেওয়ার ও জীবনের বাঁক বদলে ফেলার। সময় থাকতেই হুঁশিয়ার হওয়া জরুরি!

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।

prof.ershad92@gmail.com