অনিশ্চিত গন্তব্যে দেশের ফুটবল

Wednesday, May 20th, 2020

ছবি : বাফুফে

 

ডেস্ক নিউজঃ দর্শকবিহীন অবস্থায় বুন্দেসলিগা মাঠে গড়িয়েছে। ইউরোপের আরও কয়েকটি ফুটবল লিগ ফের শুরুর অপেক্ষায়। ঠিক এই সময়ে বাংলাদেশে দাঁড়ি টেনে দেওয়া হলো চলতি মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগে! এ মৌসুমে শুধু ফেডারেশন কাপ আর লিগের মাত্র ছয় রাউন্ড খেলা হয়েছে। স্বাধীনতা কাপ, পেশাদার লিগের দ্বিতীয় স্তর চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ, নিচের দিকের সব খেলাও শুরুর আগেই বাতিল। আগামীর পরিকল্পনা না থাকায় দেশের ঘরোয়া ফুটবল চলেছে অনিশ্চিত গন্তব্যে।

গত রোববার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) জরুরি সভায় চলতি ফুটবল মৌসুমের ইতি টানার ব্যাপারটা অনুমিতই ছিল। লিগে মাত্র ২৪ ভাগ ম্যাচ হওয়ায় চ্যাম্পিয়ন দল ঘোষণা করা হয়নি, অবনমনও নেই। যার ফলে এএফসি কাপে লিগ চ্যাম্পিয়নের কোটাটি বাংলাদেশ এবার পাবে কি না, সেটি অনিশ্চিতই থাকল। এএফসি এ ব্যাপারে পরে জানাবে বলেছে। পাশের দেশ ভারতে আই লিগের ৮৫ ভাগ খেলা শেষ হয়েছিল। তাই সেখানে চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে সেটা করা যায়নি কম ম্যাচ হওয়ায়। বাংলাদেশের লিগটা শেষ করতে অপেক্ষা করা যেত। কিন্তু ৯০ ভাগ ক্লাবেরই সেই ধের্য্য ছিল না। আর্থিক ক্ষতির কথা বলে অস্থির ক্লাবগুলো এখনি সব বাতিল করা শ্রেয় মনে করেছে।

ফুটবল ফেডারেশন এখানে ক্লাবের প্রত্যাশা পূরণে একটা সিলমোহরই মেরেছে শুধু, এর বেশি কিছু নয়। বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতিই এমন যে, ক্লাব যা চায় সেটি করতে ফেডারেশন বাধ্য। বাফুফের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও পেশাদার লিগ কমিটির সভাপতি আবদুস সালাম মূর্শেদীর বলেন, ‘আমরা খেলার পক্ষে ছিলাম। কিন্তু ক্লাবগুলো চেয়েছে বলে গোটা ফুটবল মৌসুমেই ইতি টেনেছি। তা ছাড়া করোনা পরিস্থিতিও ভালো নয়। সব দিক ভেবেই মৌসুম শেষ করতে হয়েছে।’

করোনা পরিস্থিতি ভালো নয়, এ কথা সত্যি। তবে মৌসুম বাতিলের আগে ফুটবল মাঠে গড়ানোর জন্য আরেকটু অপেক্ষা কী করা যেতে না? দেশের একমাত্র উয়েফা ‘এ’ সনদধারী কোচ মারুফুল হকের মনেও একই প্রশ্ন, ‘বাফুফে এত দ্রুত লিগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না নিলেও পারত। তাড়াহুড়োর কিছু ছিল না। আরও এক দেড় মাস দেখে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হতো।’

অথচ উল্টো আরও এক মাস আগেই বেশির ভাগ ক্লাব লিগ বাতিল চেয়ে বাফুফেকে চাপে ফেলে দেয়। বাফুফে লিগের ব্যাপারটা ঝুলিয়ে রাখছে কেন? ওঠে এমন প্রশ্নও। কিন্তু মারুফুল মনে করেন, ‘বিদেশি ফুটবলারদের বসিয়ে বসিয়ে টাকা দেওয়া নিয়েই তো যত প্রশ্ন! বিদেশিদের ছেড়ে দিয়ে শুধু স্থানীয়দের নিয়ে দুই তিন মাস পর হলেও বাকি লিগটা করা যেতে। সেটি করলে ক্লাবই বরং বেশি উপকৃত হতো।’

স্থানীয়দের নিয়ে লিগটা এ বছর শেষ হলে পরের লিগ শুরু করতে ক্লাবগুলো ৫-৬ মাস সময় নিতে পারত। ততদিনে ক্লাব আর্থিকভাবে কিছুটা গুছিয়ে উঠতে পারত। তাতে ক্লাবই লাভবান হতো। মারুফুলের যুক্তি মন্দ নয়। কিন্তু ক্লাব সেই দুরদর্শি চিন্তা করেনি। তারা উঠে পড়ে লাগে লিগ শেষ করতে। অথচ বেশ কয়েকটি ক্লাবই স্থানীয়দের ৮০-৯০ ভাগ টাকা দিয়ে দিয়েছে। কাজেই স্থানীয়দের নিয়ে অনায়াসে লিগের বাকি অংশটা খেলা যেত। তবে দুই একটি ক্লাব লিগ শুরুর পর নিয়ম পাল্টানোর বিপক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু সেটাও কাজে আসেনি।

সব একপাশে রেখে আগষ্টের ততৃীয় বা চতুর্থ সপ্তাহে নতুন মৌসুমের দলবদলের আভাস দেন বাফুফের সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু এখনও কথার কথা পর্যন্তই। নতুন মৌসুমের ব্যাপারে বাফুফের সভায় কোনো আলোচনাই হয়নি। অনলাইন সভায় বেশির ভাগ কর্মকর্তাই ছিলেন নিস্প্রভ। অথচ করোনা শেষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচগুলো যখন শুরু হয়ে যাবে, জাতীয় দলের আসল অবস্থা তখনই বোঝা যাবে। টের পাওয়া যাবে ঘরোয়া লিগ বাতিলের কুফল।

ওদিকে কয়েকটি ক্লাবের দাবি, দেশি ফুটবলারদের আগামী মৌসুম খেলতে হবে বর্তমান চুক্তিতেই। এ ব্যাপারেও নিজেদের বক্তব্য জানায়নি বাফুফে। আগামী মৌসুম বিদেশি ছাড়া খেলতে কয়েকটি ক্লাবের আবেদনের বিষয়টিও রয়ে গেছে আড়ালে। যদিও বিদেশি ছাড়া আগামী মৌসুম খেলার বিপক্ষেই মত বেশি। বিদেশি কোটা কমিয়ে ৪ থেকে ২ বা ৩ করা যেতে পারে বলছেন মারুফুল হকসহ অনেকে। জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া ডেনমার্ক থেকে বলেছেন, ‘বিদেশি খেলোয়াড় বাদ দিয়ে লিগ করলে সেটা হবে হাস্যকর।’

এই অবস্থায় অন্তত লিগের আকষর্ণের কথা ভেবে সালাম মূর্শেদী বিদেশি কোটা বাতিলের পথে হাঁটবেন না বলে জানান এই প্রতিবেদককে, ‘এই যুগে বিদেশি খেলোয়াড় বাদ দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। হয়তো কোটা কমতে পারে।’ তবে তিনি ফাঁক রেখে দিয়েছেন, ‘নতুন কমিটি এসে এসব সিদ্ধান্ত নিবে।’
অবশ্য বাফুফের মেয়াদৌত্তীর্ণ নির্বাহী কমিটির নির্বাচন কবে হবে সেটিরও এখনও ঠিক নেই। ঈদের পর আরেকটি সভা করে নতুন ফুটবল মৌসুমের ব্যাপারে জানানোর কথা বললেন সালাম। কিন্তু সেই ‘ঈদের পর’ আসতে কত সময় লাগে, সেটিও দেখার বিষয় হবে বলে অনেকের ধারণা।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ বছর আর কোনো ফুটবলই হয়তো হবে না বাফুফের আয়োজনে। কারণ, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে দলবদলে অংশ নিতে ক্লাব রাজি হবে বলে মনে হচ্ছে না। সংকটময় এই সময়ে ফেডারেশনের সঙ্গে দরকষাকষি করতে ফুটবলারদের একটা সংগঠন থাকলে ভালো হতো। কোয়াব যেমন ক্রিকেটারদের স্বার্থ নিয়ে কাজ কওে, ফুটবলে খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতি থাকলেও সেটা অকোজো এবং ফেডারেশেনর সঙ্গে স্বার্থের লড়াইয়ে জড়াতে তারা নারাজ।

এই অবস্থায় জাতীয় দলের গোলক্ষক আশরাফুল রানাসহ কয়েকজন পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে গোট মৌসুমই বাতিল করায় হতাশা ব্যক্ত করছেন। শেখ জামালের গোলরক্ষক কোচ ও জাতীয় দলের সাবেক গোলক্ষরক বিপ্লব ভট্টাচার্যেও কথা, ‘ভাই, বেকার হয়ে গেলাম!’ তবে ক্লাব থেকে ৮০-৯০ ভাগ টাকা পেয়ে যাওয়ায় অনেক ফুটবলার নিশ্চিন্ত মনে আছেন। সমস্যাটা হবে ছোট ক্লাবের ফুটবলার, রেফারি, মাঠ কর্মী, কোচিং স্টাফ ও বল বয়দের।

গত দুই মাসে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মাঠে ঘাস বড় হয়েছে। এমন ছবি ছাপা হচ্ছে পত্রিকায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই ঘাস যেন জঙ্গলে পরিণত না হয়, সেটির জন্য চাই করোনাকাল শেষে দ্রুততম সময়ে মাঠে খেলা ফেরানোর কার্যকর উদ্যোগ। আর অতি অবশ্যই বাফুফে ও ক্লাবের সদিচ্ছা।