ঠাকুরগাঁওয়ে অনুমোদন ছাড়াই চলছে ক্লিনিক-রোগনির্ণয় কেন্দ্র

Monday, October 12th, 2020
মোঃ মজিবর রহমান শেখ ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি,বাহারি সাইনবোর্ড। ভবনের দেয়ালে চিকিৎসকের নামের তালিকা। সাজানো-গোছানো আসবাব। রোগীদের ভিড়ও রয়েছে, কিন্তু নেই শুধু লাইসেন্স। এই চিত্র ঠাকুরগাঁও  জেলার বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও রোগনির্ণয় কেন্দ্রের। ঠাকুরগাঁও
জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রমতে, ঠাকুরগাঁও জেলায় ১১১টি ক্লিনিক ও রোগনির্ণয় কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি ক্লিনিক ও ৬৮টি রোগনির্ণয় কেন্দ্র। এসব রোগনির্ণয় কেন্দ্রের মধ্যে ২৪টি বিভিন্ন ক্লিনিকের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে বেসরকারি ক্লিনিক-রোগনির্ণয় কেন্দ্রের সংগঠন বাংলাদেশ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, তাদের সংগঠনে ঠাকুরগাঁও জেলায় ৪০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে এর মধ্যে কতটি ক্লিনিক ও রোগনির্ণয় কেন্দ্র, তা জানা যায়নি। দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২ অনুযায়ী বেসরকারি ক্লিনিক ও রোগনির্ণয় কেন্দ্র চালানোর জন্য শর্ত পূরণ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছ থেকে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। লাইসেন্স প্রদান কর্তৃপক্ষ বলছে, ক্লিনিকের শয্যার অনুপাতে নিজস্ব চিকিৎসক সহ লোকবল, ভবনের আয়তন, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রোপচারকক্ষ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের সুনির্দিষ্ট শর্ত আছে। রোগনির্ণয় কেন্দ্রের ক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতি, অনুমোদিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ঔষুধ ও নিজস্ব পরীক্ষাগার থাকতে হবে। কিন্তু ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে জেলার ক্লিনিক ও রোগনির্ণয় কেন্দ্রগুলো লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই চলছে। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও রোগনির্ণয় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নেই অথবা লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি, তাদের নিবন্ধন ও লাইসেন্স নবায়নের জন্য সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২৩ আগস্ট। ঐ সময়ের মধ্যে সদরের ৩২টি ক্লিনিকের মধ্যে ২৯টি ও রানীশংকৈল উপজেলায় ৬টির মধ্যে ১টি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেছে। তবে বালিয়াডাঙ্গী ও পীরগঞ্জের কোনো ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স নবায়নে আবেদন করেনি। আর ঠাকুরগাঁও জেলার ৬৮টি রোগনির্ণয় কেন্দ্রের মধ্যে ঠাকুরগাঁও জেলার  সদর উপজেলার ৪২টির মধ্যে ৩৯টি, রানীশংকৈলের ৭টির মধ্যে ৩টি, হরিপুরের ৪টির মধ্যে ২টি ও পীরগঞ্জের ১১টির মধ্যে ৩টি প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেছে। তবে বালিয়াডাঙ্গীর চারটি প্রতিষ্ঠানের একটিও আবেদন করেনি। ঠাকুরগাঁও
সদর, রানীশংকৈল, পীরগঞ্জ ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ক্লিনিক ও রোগনির্ণয় কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের হিউম্যান বেবি কেয়ার হাসপাতাল, হাজীপাড়ার সূর্যের হাসি নেটওয়ার্ক, একতা নার্সিং সেন্টার ও নর্দান মা ও শিশু হাসপাতাল, পীরগঞ্জের মাতৃসেবা ক্লিনিক, ডায়াবেটিক হাসপাতাল, আধুনিক ক্লিনিক অ্যান্ড নার্সিং হোম, আদর্শ ক্লিনিক, রানীশংকৈলের ডক্টরস ক্লিনিক, মা ও শিশু হাসপাতাল শুরু থেকেই লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে চলছে। ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকেরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। লাইসেন্স নবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো ফেলে রাখতে পারেন না। জুলফিকার আলী, সভাপতি, ঠাকুরগাঁও জেলা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যাসোসিয়েশন । ঠাকুরগাঁও জেলা সদরের ৪২টির মধ্যে ৯টি, পীরগঞ্জের ১২টির মধ্যে সব কটি , হরিপুরের ৪টির মধ্যে ২টি, বালিয়াডাঙ্গী ও রানীশংকৈলে ৩টি করে রোগনির্ণয় কেন্দ্রের লাইসেন্স নেই।
যৌথ অংশীদারত্বে পরিচালিত হয় রানীশংকৈলের ডক্টরস ক্লিনিক। ক্লিনিকটির এক অংশীদার হলেন আহমেদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার শুরুতেই নানা জটিলতার কারণে লাইসেন্স ছাড়া ক্লিনিকটির সেবা চালু রাখতে হয়েছে। পরে স্বাস্থ্য বিভাগের সব শর্ত পূরণ করে অনলাইনে লাইসেন্সের আবেদন করেছি। অল্প সময়ের মধ্যে আমরা লাইসেন্স পেয়ে যাব।’বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো লাইসেন্স নবায়ন না করলে সেগুলো অবৈধ ঘোষণা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। মাহফুজার রহমান সরকার, সিভিল সার্জন, ঠাকুরগাঁও ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের ঠাকুরগাঁও জেলা সভাপতি জুলফিকার আলী বলেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত অধিকাংশ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়ন করা ছিল। ২০১৮ সালের পর থেকে অনলাইনে নতুন লাইসেন্স গ্রহণ ও পুরোনো লাইসেন্স নবায়নপ্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে ঠাকুরগাঁও  জেলার ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া আটকে গেছে। এখন কোনো প্রতিষ্ঠানেরই লাইসেন্সের নবায়ন নেই। ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকেরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। লাইসেন্স নবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো ফেলে রাখতে পারেন না। সিভিল সার্জন মাহফুজার রহমান সরকার জানান, বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো লাইসেন্স নবায়ন না করলে সেগুলো অবৈধ ঘোষণা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। ঠাকুরগাঁও জেলার পরিস্থিতি জানিয়ে গত মাসে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।